সর্বশেষ খবর
গতি আর ভদ্রতার যুগলবন্দি: জন্মদিনে ফিরে দেখা ‘মাইসোর এক্সপ্রেস’ জাভাগল শ্রীনাথকে
প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদন: আজকের ভারতীয় ক্রিকেটে যশপ্রীত বুমরাহ, মহম্মদ শামিদের আগুনে পেস বোলিং দেখে গোটা বিশ্ব সমীহ করে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে যখন ভারতীয় ক্রিকেট মানেই ছিল ঘূর্ণি পিচ আর স্পিনারদের দাপট, তখন মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন এক তরুণ। মসৃণ রান-আপ, চওড়া কাঁধ আর অনবদ্য ফলো-থ্রু নিয়ে তিনি যখন বল ছাড়তেন, তখন বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটারদের স্টাম্প উড়ে যেত। তিনি আর কেউ নন, ভারতীয় পেস বোলিংয়ের রূপকার— জাভাগল শ্রীনাথ। আজ, ৩১ আগস্ট, ভারতীয় ক্রিকেটের এই নিঃশব্দ যোদ্ধার জন্মদিন। স্বতন্ত্র খবর তাঁকে শ্রদ্ধা ও শুভকামনা জানাচ্ছে।
১৯৬৯ সালের এই দিনে কর্ণাটকের হাসান জেলায় জন্ম নেওয়া এই ডানহাতি ফাস্ট বোলার পা দিলেন জীবনের এক নতুন বসন্তে। একসময়ের গতিদানব আজ আইসিসি-র সম্মানিত ম্যাচ রেফারি। কিন্তু জন্মদিনে তাঁর ক্রিকেট জীবনের রূপকথা আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, কেন তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অনন্য পথপ্রদর্শক।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের রণকৌশল ছিল অত্যন্ত সহজ সরল। দেশের মাটিতে অনিল কুম্বলে, বেঙ্কটপতি রাজু কিংবা রাজেশ চৌহানদের স্পিন বিষে প্রতিপক্ষকে নীল করা। আর বিদেশের মাটিতে কপিল দেবের বিষহীন হতে থাকা সুইংয়ের ওপর ভরসা রাখা। ঠিক এইরকম একটা ক্রান্তিলগ্নে ১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে ভারতীয় দলে অভিষেক ঘটে এক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়ার। মারিমাল্লাপ্পা হাইস্কুল এবং মাইসোরের শ্রী জয়চামরাজেন্দ্র কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ইন্সট্রুমেন্টেশন নিয়ে পাশ করা সেই ছেলেটি নেটে বল করতে গিয়ে চমকে দিয়েছিলেন দিলীপ বেঙ্গসরকরের মতো কিংবদন্তিকে। তাঁর একটি বিষাক্ত বাউন্সারে বেঙ্গসরকরের হাত থেকে ব্যাট ছিটকে গিয়েছিল। নির্বাচকরা বুঝতে পেরেছিলেন, ভারতের বহু প্রতীক্ষিত ‘স্পিড স্টার’ এসে গিয়েছেন।
পরবর্তী এক দশক ধরে ভারতীয় দলের পেস আক্রমণের জোয়াল একাই টেনেছেন শ্রীনাথ। কপিল দেবের অবসরের পর দীর্ঘ ৯ বছর তিনিই ছিলেন ভারতের এক নম্বর স্ট্রাইক বোলার। সেই যুগে যখন স্পিড গান বা গতির পরিমাপক যন্ত্র অতটা আধুনিক ছিল না, তখনও ১৯৯৭ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে শ্রীনাথের একটি বলের গতি মাপা হয়েছিল প্রতি ঘণ্টায় ১৫৭ কিলোমিটার। যা তৎকালীন সময়ে অ্যালান ডোনাল্ড বা ওয়াকার ইউনিসদের গতির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
জাভাগল শ্রীনাথের ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তিনি কতটা ধারাবাহিক ছিলেন। ভারতের মতো স্পিন-বান্ধব পিচে খেলেও তিনি যে রেকর্ড তৈরি করেছেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। ৬৭ টেস্টে তাঁর উইকেট সংখ্যা ২৩৬টি। অন্যদিকে ২২৯টি ওয়ানডেতে ৩১৫ উইকেট পেয়েছেন তিনি।
শ্রীনাথ ভারতের দ্বিতীয় পেস বোলার হিসেবে টেস্টে ২০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে (ODI) তিনিই প্রথম ভারতীয় পেসার, যিনি ৩০০ উইকেটের গণ্ডি পার করেছিলেন। আজ পর্যন্ত ওডিআই-তে ভারতের পক্ষে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারিদের তালিকায় অনিল কুম্বলের পরেই তাঁর স্থান।
শ্রীনাথের ক্যারিয়ারের দুটি ইনিংস ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। প্রথমটি ১৯৯৬ সালের আহমেদাবাদ টেস্ট। শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে জয়ের জন্য ভারতের প্রয়োজন ছিল মাত্র ১৭০ রান। কিন্তু গ্রায়েম স্মিথদের যুগের সেই প্রোটিয়া ব্যাটিং লাইনআপকে একাই ধ্বংস করে দেন শ্রীনাথ। মাত্র ২১ রান দিয়ে তুলে নেন ৬টি উইকেট। তাঁর সেই আগুনের স্পেলের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস। ভারত ম্যাচটি জিতেছিল অনায়াসে।
দ্বিতীয়টি ১৯৯৯ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ। পাকিস্তানের দুর্দান্ত ব্যাটিং লাইনের বিরুদ্ধে ইডেনের চেনা পিচে শ্রীনাথ একাই তুলে নিয়েছিলেন ৪৬ রানে ৮ উইকেট। সাঈদ আনোয়ারের সেই অবিশ্বাস্য ১৮৮ রানের ইনিংসটি না থাকলে পাকিস্তান সেদিন দাঁড়াতেই পারত না শ্রীনাথের সুইং আর বাউন্সের সামনে। ম্যাচে মোট ১৩টি উইকেট নিয়েছিলেন তিনি, যা তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।
২০০২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে হোম সিরিজের পর শ্রীনাথ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শরীর আর সায় দিচ্ছিল না, বারবার চোটের আঘাতে জর্জরিত হচ্ছিলেন। কিন্তু তৎকালীন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় জানতেন, ২০০৩ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে এই অভিজ্ঞ ঘোড়াটিকে তাঁর কতটা প্রয়োজন। সৌরভ নিজে উদ্যোগী হয়ে শ্রীনাথকে বুঝিয়ে অবসর ভেঙে ওডিআই ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনেন।
অধিনায়কের সেই আস্থার মর্যাদা অক্ষরে অক্ষরে রেখেছিলেন শ্রীনাথ। বিশ্বকাপের ঠিক আগে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ৭ ম্যাচে ১৮ উইকেট নিয়েছিলেন। আর ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতের ফাইনাল যাত্রায় জহির খান ও আশিস নেহরার মেন্টর হিসেবে খেলেন তিনি। টুর্নামেন্টে ১১ ম্যাচে ১৬টি উইকেট নিয়েছিলেন শ্রীনাথ, যার ইকোনমি রেট ছিল মাত্র ৪.০৫। যদিও ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে রিকি পন্টিংদের তাণ্ডবে ১০ ওভারে ৮৭ রান দিয়ে বসেন তিনি, যা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। কিন্তু গোটা টুর্নামেন্টে তাঁর অবদান ভারতবাসী কোনও দিন ভুলবে না। ভারতের হয়ে ৪টি বিশ্বকাপ খেলে মোট ৪৪টি উইকেট শিকার করেছেন তিনি, যা এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপে যৌথভাবে কোনও ভারতীয় বোলারের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
জাভাগল শ্রীনাথ শুধু একজন দুর্দান্ত বোলারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ক্রিকেটের আসল ‘জেন্টলম্যান’। আউটলুক ইন্ডিয়া একবার তাঁকে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছিল, “একজন নিরামিষভোজী, দক্ষিণ ভারতীয় এবং একজন খাঁটি ভদ্রলোক— অথচ বিশ্বমানের ফাস্ট বোলার”। মাঠে স্লেজিং করা কিংবা ব্যাটারের দিকে তেড়ে যাওয়া তাঁর স্বভাবে ছিল না। ব্যাটারকে পরাস্ত করে কেবল একটা মৃদু হাসতেন। তাঁর এই শান্ত স্বভাবের কারণেই সতীর্থ থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষ— সকলেই তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর দীর্ঘদিনের বোলিং পার্টনার বেঙ্কটেশ প্রসাদ একবার বলেছিলেন, “ভারত আজ পর্যন্ত যত প্রকৃত ফাস্ট বোলার তৈরি করেছে, শ্রীনাথ তাদের মধ্যে অন্যতম সেরা এবং একই সঙ্গে অসাধারণ রসবোধসম্পন্ন একজন মানুষ”।
১৯৯৯ সালে অর্জুন পুরস্কারে ভূষিত হওয়া এই ক্রিকেটার অবসরের পর ধারাভাষ্যকার হিসেবেও কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে অনিল কুম্বলের প্যানেল থেকে কর্ণাটক ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (KSCA) সচিব নির্বাচিত হন। ২০০৬ সাল থেকে তিনি আইসিসি-র ম্যাচ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং অত্যন্ত সফলভাবে ২৫০টিরও বেশি ওডিআই ম্যাচে ম্যাচ রেফারির ভূমিকা পালন করেছেন।
আজকের ভারতীয় ক্রিকেটের রমরমা, আইপিএলের কোটি কোটি টাকা আর পেসারদের জয়জয়কারের দিনে জাভাগল শ্রীনাথের মতো নিঃশব্দ ক্রিকেটারদের অবদান যেন কোথাও একটু ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু নতুন প্রজন্মের পেসাররা যখনই লাল বা সাদা বল হাতে তুলে নেন, তাঁদের রান-আপের প্রতিটি পদক্ষেপে মিশে থাকে ‘মাইসোর এক্সপ্রেস’-এর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার। শুভ জন্মদিন, জাভাগল শ্রীনাথ! ভারতবাসী আপনার সেই চওড়া কাঁধের ভরসাকে আজীবন মনে রাখবে।

