সর্বশেষ খবর
মাঠ কাঁপানো সেই ‘চিনের প্রাচীর’: জন্মদিনে শ্রদ্ধায় স্মরণ মান্নাদাকে
প্রকাশিত: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদন: সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিনটি ভারতীয় ফুটবলের এক সোনালি অধ্যায়ের উদযাপনের দিন। আজ কিংবদন্তি ফুটবলার শৈলেন্দ্রনাথ মান্না, ময়দানের ভালোবাসার ‘মান্নাদা’-র জন্মবার্ষিকী। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ভারতীয় ফুটবলের যে স্বর্ণযুগ, তার অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি ছিলেন হাওড়ার এই অদম্য জেদি বাঙালি ফুটবলার। রক্ষণভাগে তাঁর ইস্পাতকঠিন ডিফেন্সের সামনে খেই হারিয়ে ফেলতেন ইউরোপ-এশিয়ার বাঘা বাঘা স্ট্রাইকাররা।
ময়দানে বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার অন্য নাম শৈলেন মান্না। ১৯৪২ সালে হাওড়া ইউনিয়ন ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন প্রিয় ক্লাব মোহনবাগানে। এরপর টানা ১৯টি বছর তিনি সবুজ-মেরুন জার্সির ঐতিহ্যকে আগলে রেখেছিলেন। ফুটবল খেলার জন্য ক্লাব থেকে তিনি কোনও পারিশ্রমিক বা অর্থ নিতেন না, বরং জিএসআই (জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া)-র সামান্য সরকারি চাকরি করেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ক্ষুরধার নেতৃত্বেই ১৯৫১ সালের প্রথম এশিয়ান গেমসে সোনা জিতেছিল ভারত এবং ১৯৫২ সালের হেলসিঙ্কি অলিম্পিক্সে খালি পায়ে খেলতে নেমে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল নীল বাঘেরা। সে সময় ফুটবল-বিশেষজ্ঞরা মনে করতেন, গোষ্ঠ পালের পর এ দেশ শৈলেন মান্নার মতো এত বড় ডিফেন্ডারের সন্ধান আর পায়নি। খালিপায়ে রুখে দিয়েছেন দেশ-বিদেশের স্ট্রাইকারদের। দলের দুর্গ শৈলেন মান্নার ট্যাকল অতিক্রম করে এগোনো প্রতিপক্ষের কাছে ছিল দুরূহ ব্যাপার। এমন ডিফেন্ডারকে তাঁর সারা জীবনে এক বারের জন্যও রেফারির কার্ড দেখতে হয়নি। এটাও বিশ্ব ফুটবলে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। শুধু ট্যাকলই নয়, বিশেষ পারদর্শী ছিলেন ফ্রি-কিক মারায়। অসাধারণ দক্ষতায় বল স্যুইং করাতেন। খেলতেন লেফ্ট ব্যাকে। দু’পা সমান চলত তার। তাঁর দূরপাল্লার জোরালো শট বিপক্ষ অনুমানই করতে পারত না। তবে ফ্রি-কিক মারতেন ডান পায়ে। বলেছেন, একমাত্র ডান পায়েই বলকে স্যুইং করাতে পারতেন।
ফুটবল ইতিহাসে তাঁর সততা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি কতটা অনন্য ছিল, তার প্রমাণ মেলে ১৯৫৩ সালে। ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (FA) তাদের ইয়ারবুকে শৈলেন মান্নাকে বিশ্বের সেরা ১০ জন অধিনায়কের তালিকায় স্থান দিয়েছিল, যা আজ পর্যন্ত কোনও এশীয় ফুটবলারের কাছে এক পরম ও দুর্লভ সম্মান। ১৯৭১ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে এবং ২০০১ সালে তিনি মোহনবাগানের প্রথম ‘মোহনবাগান রত্ন’ খেতাব পান।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরাও তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করেছেন বরাবর। তিনি বলেছেন, “তবে কোন সমর্থকই বা চায় তাদের ক্লাব আমার জন্য সাফার করুক। একটা অভিমান তো কাজ করতই যে, সারা জীবন আমি কেন তাদের ক্লাবে না খেলে মোহনবাগানে থেকে গেলাম।” সাফল্য ও স্বীকৃতির এত প্রাপ্তির মাঝেও অনুশোচনার কাঁটা বিদ্ধ করেছে শৈলেন মান্নাকে। ১৯৫০ সালে বিশ্বকাপের মূল পর্বে সুযোগ পেয়েও ভারতীয় দলের না যাওয়া, ১৯৪৮-এর লন্ডন অলিম্পিক্সে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত খেলেও পেনাল্টি মিস করা তাঁকে বার বার যন্ত্রণা দিয়েছে। সেই অলিম্পিক্সে ভারত প্রথম ম্যাচেই ফ্রান্সের কাছে ১-২ গোলে হেরে বিদায় নেয়। ভারতের হয়ে একমাত্র গোলটি করেছিলেন এস রামন। প্রথম পেনাল্টি মিস করার পর শৈলেন মান্না ভয়ে আর দ্বিতীয় পেনাল্টি পেয়েও মারতে যাননি। মহাবীর প্রসাদ মারেন এবং তিনিও নষ্ট করেন। হারলেও ভারতের খেলা দেখে সে দিন মুগ্ধ হয়েছিলেন লন্ডনের হাজার হাজার দর্শক। অবাক হয়েছিলেন ভারতীয়দের খালিপায়ে খেলতে দেখে। ‘রাজকুমারী’ এলিজ়াবেথ, তাঁর বোন মার্গারেট এবং স্বামী ফিলিপকে নিয়ে খেলা দেখতে এসেছিলেন। শোনা যায়, এলিজ়াবেথ শৈলেন মান্নার পা ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিলেন তা সত্যিকারের রক্তমাংসের পা কি না।
আজ ময়দানের অলিতে-গলিতে, ক্লাব তাঁবুতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে ফুটবলের এই চিরকালীন আদর্শকে, যাঁর স্মৃতি আজও বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের মনে রোমাঞ্চ জাগায়। স্বতন্ত্র খবর তাঁকে আন্তরিক শ্রদ্ধা ও প্রণাম নিবেদন করছে।

