ষষ্ঠীতে দেবী কাত্যায়নী
ঋগ্বেদভাষ্যকার মহর্ষি কাত্যায়ন ছিলেন বাৎসল্য ভাবের সাধক। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর তাঁর আশ্রমে গমণ করেন এবং তাঁদের দেহের শক্তি মন্থন করে এই চতুর্ভুজা দেবীকে সৃষ্টি করেন।দেবীকে মহর্ষি কাত্যায়ন প্রথমে পূজা করেন।কাত্যায়ন ঋষির কন্যা হিসাবে দেবীর নাম হলো কাত্যায়নী। কাত্য শব্দের অর্থ ব্রহ্মজ্ঞ।অয়ন শব্দের অর্থ দুটি—আশ্রয় ও পথ।ব্রহ্মজ্ঞদের যিনি আশ্রয় তিনি কাত্যায়ন,স্ত্রীলিঙ্গে কাত্যায়নী।ব্রহ্মজ্ঞরা যে পথের মাধ্যমে লোককল্যাণ করেন তিনিই কাত্যায়নী।ব্রহ্মজ্ঞরা তো মায়ের অব্যক্ত রূপে লীন হয়ে যান। তাহলে আবার মায়ের ব্যক্তরূপের বা শক্তির সাহায্য নেন কেন? যেকোন কাজই শক্তির খেলা। এজন্য লোককল্যাণের যেকোন কাজেই মায়ের ব্যক্তরূপ বা শক্তির সাহায্য নিতে হয়। তাছাড়া ব্রহ্মজ্ঞদের অহম্ বোধ না থাকায় মা-ই তাঁদের মাধ্যমে কাজ করেন। এজন্য মাকে ব্রহ্মজ্ঞদের আশ্রয় বা পথ অর্থাৎ কাত্যায়নী বলা হয়। এই স্তরে উঠলে সূক্ষ্ম শক্তিগুলির প্রতি সাধক আর আকর্ষণ বোধ করেন না। এই স্তরে সাধক অনুভব করেন তিনি যেন এক বৃত্তের কেন্দ্র। দেহ মনের অতীত 'আমি' অনুভব নিয়ে তিনি রয়েছেন এই কেন্দ্রে। বৃত্তের পরিধিতে, তার চারিদিকে, খেলা করে যাচ্ছে অসংখ্য উচ্চতর শক্তি, আর এই শক্তিগুলির ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সবকিছুই তরঙ্গের মত উঠছে নামছে। তিনি শুধু দ্রষ্টা বা সাক্ষী। বিশ্বজগৎ, সৃষ্টি-স্থিতি- লয় অসংখ্য ঘটনার স্রোত আপনার সামনে খেলতে খেলতে চলেছে, আপনি এসব থেকে আলাদা, শুধু দেখে যাচ্ছেন, নিঃশব্দে। এই হলো মায়ের কাত্যায়নী রূপ। মায়ের মত সাধকও অসীম ঐশ্বর্যের মধ্যে থেকেও এসব থেকে আলাদা। কোন আকর্ষণ বোধ করেন না ওই ঐশ্বর্যের প্রতি। সাধনার প্রতিটি স্তরে মা আসেন সাধককে সাহায্য করতে। বিভিন্ন সংকটে, ভয়ে, লোভে, সাধককে রক্ষা করার জন্য, তাকে সাহায্য করার জন্য মা নয়টি রূপে যেমন আবির্ভূত হন, তেমনি আসেন অষ্টমার্তৃকা এমনকি দিব্য আত্মারাও। সাধনা করতে করতে সাধক এটি বুঝতে পারেন। আমরা সাধারণ মানুষ শুধু প্যান্ডেল দেখি, আলোর ঝলকানি দেখি, আনন্দ করি আর ঘুরে বেড়াই। আমাদের মধ্যে এই শক্তির উপলব্ধি কিছুই আসে না। আজ মহাষষ্ঠী তিথিতে নবদুর্গার ষষ্ঠরূপ কাত্যায়নীরূপে মা আবির্ভূতা।

